আইজ্যাক অসিমভের “বিলিফ”

Posted on Updated on

এক

“তুমি কি কখনো স্বপ্নে উড়তে দেখেছ নিজেকে?” ডঃ রজার টমি তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করে।

জেন টনি চোখ তুলে তাকায়,”অবশ্যই!”

কিন্তু তার দ্রুত বুননরত হাত যেটা বর্তমানে একটা জটিল এবং খুবই অপ্রয়োজনীয় পুতুল তৈরী করছে, বন্ধ হলো না। ঘরের টেলিভিশন একটা অনাকর্ষনীয় অনুষ্ঠান প্রদর্শন করছে প্রায় নিঃশব্দ আওয়াজে। 

রজার বলল,”সকলেই উড়ার স্বপ্ন দেখে কখনো কখনো। এটা স্বাভাবিক ব্যাপার। আমি এটা অনেকবার করেছি। যা আমাকে চিন্তার মধ্যে ফেলেছে।”

জেন বলল,” আমি বুঝতে পারছি না তুমি কি বলতে চাইছ।কিন্তু এটা নিয়ে আলাপ করতে ভাল লাগে না।” সে নিঃশব্দে সেলাই গুনতে লাগল। “যখন তুমি এটা ভাববে, তুমি আশ্চর্য হবে। এটা আসলে ঠিক উড়া নয় যা তুমি কল্পনা কর। তোমার পাখা নেই; অন্তত আমারতো নেই। এখানে কোন এফোর্ট থাকে না। তুমি জাষ্ট ভাসতে থাক। এটাই। ভাসতে থাকা।”

“যখন আমি উড়ি,” জেন বলতে থাকে,” আমার প্রতিটা ডিটেইলস মনে নেই। একটা বিষয় ছাড়া যে আমি সিটি হলের মাথায় ল্যান্ড করি এবং আমার গায়ে একটা সুতোও নেই। কেন জানি কেউই তোমাকে খেয়াল করে না যখন তুমি স্বপ্নে নগ্ন থাকো। কখনো খেয়াল করেছ? তুমি বিব্রতকর অবস্থার আশা করছ কিন্তু লোকজন তোমাকে জাষ্ট ইগনোর করছে।”

জেন সুতোতে টান দিল এবং সুতোর বলটা ব্যাগ থেকে ছিটকে মেঝেতে পরে প্রায় অর্ধেক ফ্লোর পার করে ফেলেছে। ওদিকে তার নজর নেই।

রজার ধীরে ধীরে তার মাথা নাড়ছে। এ সময়, তার মুখ ম্লান আর তাতে সন্দেহের ছায়া ফুটে উঠে। যেকোন দিক থেকে তার চাপার হাঁড় দেখা যাচ্ছিল, সোজা লম্বা নাক এবং জুলফিতে পাঁকা চুলের পরিমান অতিদ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছিল গত কয়েক বছরের তুলনায়। রজারের বয়স এখন পয়ত্রিশ।

সে বলল,” তুমি কখনো ভেবেছ কেন তুমি ভাসমান হওয়ার স্বপ্ন দেখ?”

“না, ভাবিনি।”

জেন টনি স্বর্নাকেশী এবং ছোটখাটো। ওর সৌন্দর্য অনেকটা চাপা টাইপের, এমনিতে আপনার চোখে ধরা পরবে না কিন্তু আপনি সেই সৌন্দর্যকে উপেক্ষাও করতে পারবেন না। তার চোখ উজ্জল নীল আর চীনামাটির পুতুলের মত গোলাপি কপোল। ওর বয়স সবে ত্রিশ।

রজার বলল,” অধিকাংশ স্বপ্নই মূলত মনের অর্ধবোধ্য উদ্দীপক অনুভুতির অনুবাদ মাত্র। এই উদ্দীপকগুলো জোড় করে ক্ষনিকের মধ্যে একটা গ্রহনযোগ্য বিষয় হিসেবে প্রদর্শিত হয়।”

জেন বলল,” কি মাথামুন্ডু বলছ, ডারলিং?”

রজার বলল, ” শোন, একবার আমি স্বপ্নে দেখছি যে আমি একটি হোটেলে। একটি ফিজিক্স কনভেনশনে যোগ দিতে গিয়েছি। আমার সব পুরোনো বন্ধুরা আমার সাথে। সবকিছু একদম স্বাভাবিক। হঠাৎ, একটা দুর্বোধ্য চিৎকার চেচামেচি শুরু হলো বাইরে কোথাও এবং কোন কারন ছাড়াই আমরা সকলেই আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে ছোটাছুটি শুরু করলাম। আমি দৌড়ে দরজার কাছে গেলাম কিন্তু সেটা খুলতে পারছিলাম না। একজন একজন করে, আমার বন্ধুরা অদৃশ্য হচ্ছিল। তাদের কোন অসুবিধাই হচ্ছিল না রুম থেকে বের হতে, কিন্তু শুধুমাত্র আমিই কেবল বুঝতে পারছিলাম না কিভাবে তারা এটা করছিল। আমি ওদের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করছিলাম কিন্তু ওরা আমাকে সম্পূ্র্ন অগ্রাহ্য করছিল।”

” আমার মনে হচ্ছিল হোটেলে আগুন লেগেছে। কিন্তু আমি ধোঁয়ার কোন অস্তিত্ব পাচ্ছিলাম না। আমি নিশ্চিতভাবেই জানতাম ওখানে আগুন লেগেছে। আমি দৌড়ে জানালার কাছে গেলাম এবং একটা ফায়ার এস্কেপ বিল্ডিং এর বাইরে দেখতে পেলাম। আমি প্রতিটা জানালা খোলার চেষ্টা করেছি কিন্তু কোনভাবেই ফায়ার  এস্কেপের কাছে যেতে পারলাম না। আমি তখন হোটেল রুমে একদম একা। আমি জানালা দিয়ে মাথা গলিয়ে বিকারগ্রস্থের মত চিৎকার করতে লাগলাম।কেউ আমার চিৎকার শুনছিল না।”

“তারপর ফায়ার ইঞ্জিনগুলোকে আসতে শুনলাম, ছোট ছোট লাল আলো লেপ্টে ছিল পুরো রাস্তায়। আমার পরিস্কার মনে আছে। অ্যালার্ম বেলগুলো তীব্র আওয়াচ করছিল রাস্তার ট্রাফিক সরানোর জন্য। আমি ওগুলো শুনতে পাচ্ছিলাম, তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকল তাদের শব্দ যেন আমার মাথা ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে। আমি জেগে উঠলাম এবং, অবশ্যই, অ্যালার্ম ঘড়িটা বাজছিল।”

“নিশ্চয়ই আমি তো বড় কোন সপ্ন দেখছিলাম না। কারন এত বড় একটা স্বপ্ন ডিজাইন করা হয়নি যে যেখানে স্বপ্নটি শেষ হবে বা স্বপ্নটি শেষ হবার কথা অ্যালার্মটা ঠিক মত সেখানেই বেঁজে উঠবে। বরং এটাই বেশি গ্রহনযোগ্য যে আমি স্বপ্নটা দেখা শুরু করেছি যখন অ্যালার্ম বাঁজা শুরু হয়েছে এবং পুরো ঘটনার একটা অনুভুতি সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে আমার মস্তিস্কে প্রোথিত হয়েছে। এটা আমার মস্তিস্কের একটা ঝটপট ব্যাখ্যা যা সে আমাকে ব্যক্ত করেছে, যখন কোলাহল আমার নিরব পরিবেশে অনুপ্রবিষ্ট হয়েছে।”

জেন বিরক্ত হলো। সে তার বুনন কাজ নামিয়ে রাখল। “রজার! কলেজ থেকে ফেরার পর থেকেই তুমি খুবই বিচিত্র আচরন করছ। তুমি বেশী কিছু খেলেও না এবং এখন এই ফালতু আলোচনা। তোমাকে এতটা রুগ্ন আসি কখনোই দেখিনি। তোমার এখন যেটা বেশী প্রয়োজন তা হলো এক ডোজ বাইকার্বনেট।”

” আমার তার চাইতেও বেশী কিছু দরকার।” রজার নিচুস্বরে বলল। ” এখন বলত, কেন আমারা শূন্য ভাসমান হবার স্বপ্ন দেখি?”

” তুমি যদি কিছু মনে না কর, আমরা আলোচনার বিষয়টা পরিবর্তন করতে পারি!” জেন উঠে দাড়াল এবয় দৃঢ় হাতে টেলিভিশনের আওয়াজ বাড়িয়ে দিল। একজন তুলতুলে গালের তরুন ভদ্রলোক হঠাৎ তার মর্মস্পর্শী গলায় তার অমর প্রেমের কাহিনী শোনাতে লাগল।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s